ঋত্বিক ঘটক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ঋত্বিক ঘটক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

ইউ আর অলওয়েজ অ্যা পার্টিজান, ফর অর অ্যাগেইস্ট । একজন ঋত্বিকঃ পার্টিশন ট্রিলজী ও অনান্য



১.ঠোঁটে পাতার বিড়ি আর হাতে বাংলা মদের বোতল। মাথাভর্তি এলোমেলো চুল, ক্ষুরের স্পর্শাভাবে গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। পরনে ধূলিমলিন পাজামা-পাঞ্জাবি
র সঙ্গে কাঁধে একটা শান্তিনিকেতনী ঝোলা। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, সে চোখে কৌতুক মেশানো ধারালো দৃষ্টি। ‘তিনি কে’ এই প্রশ্ন কেউ করলে কোনোরকম হেঁয়ালি না করেই সরাসরি জবাব দিয়ে দেবেন - ‘আমি এক মাতাল। ভাঙ্গা বুদ্ধিজীবী, ব্রোকেন ইন্টেলেকচুয়াল।’ এই হলো কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটকের লেন্সের ভেতর দিয়ে নিজেকে দেখার উপলব্ধি।

২.
তার মদ্যপান নিয়ে একটা মজার ঘটনা প্রচলিত আছে। এক রাত্রে ঋত্বিক ফিরছেন, ঠিক হেঁটে ফেরার অবস্থায় নেই তখন আর। ট্যাক্সি, অগত্যা, পকেটে পয়সা না থাকা সত্ত্বেও।
‘ভাড়া, স্যার...’
‘আমার কাছে টাকা নেই। তুমি এক কাজ কর - এখান থেকে সোজা ১/১ বিশপ লেফ্রয় রোডে চলে যাও। সেখানে গিয়ে দেখবে, একটা ঢ্যাঙা লোক দরজা খুলবে। ওকে বোলো, ঋত্বিক ঘটক ট্যাক্সি করে ফিরেছে, সঙ্গে টাকা ছিল না। ও টাকা দিয়ে দেবে।




৩.
ঋত্বিকের বার বার শিল্পমাধ্যম পরিবর্তনের ব্যাখ্যা তিনি নিজেই দিয়েছিলেন এভাবে, ‘ছবি লোকে দেখে। ছবি দেখানোর সুযোগ যতদিন খোলা থাকবে, ততদিন মানুষকে দেখাতে আর নিজের পেটের ভাতের জন্য ছবি করে যাব। কালকে বা দশ বছর পরে যদি সিনেমার চেয়ে ভালো কোনো মিডিয়াম বেরোয় আর দশ বছর পর যদি আমি বেঁচে থাকি, তাহলে সিনেমাকে লাথি মেরে আমি সেখানে চলে যাব। সিনেমার প্রেমে নেশায় আমি পড়িনি। আই ডু নট লাভ ফিল্ম।’
এখন প্রশ্ন হতে পারে, তিনি ফিল্ম ভালোবাসেন না কিন্তু শিল্পচর্চার মাধ্যমে অধিক মানুষের কাছে পৌঁছানোর তাঁর এই তাগিদের উদ্দেশ্যটা কী? এই বিষয়ে ঋত্বিকের মতামত হলো, ‘প্রতিবাদ করা শিল্পীর প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব। শিল্প ফাজলামি নয়। যারা প্রতিবাদ করছে না তারা অন্যায় করছে। শিল্প দায়িত্ব, আমার অধিকার নেই সে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার। শিল্পী সমাজের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। সে সমাজের দাস। এই দাসত্ব স্বীকার করে তবে সে ছবি করবে।’



৪.
১৯৫৯ সালের ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে অযান্ত্রিক প্রদর্শিত হয়। সেখানে ছবিটি দেখার অভিজ্ঞতা বিখ্যাত সমালোচক জর্জেস সাডৌল বর্ণনা করেন এভাবে, ‘অযান্ত্রিক কথাটার অর্থ কি? আমার জানা নেই এবং আমার বিশ্বাস ভেনিস ফেস্টিভ্যালের কারোরই এটা জানা ছিল না। আমি পুরো গল্পটাও বলতে পারব না, কারণ সেখানে কোনো সাবটাইটেল ছিল না। কিন্তু এতদসত্ত্বেও আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি দেখেছিলাম।’
সত্যজিৎ রায় অযান্ত্রিক ছবিটি দেখে ঋত্বিককে বলেছিলেন, ‘ঋত্বিকবাবু, সিনেমাটা সময় মতো রিলিজ করলে আপনি পথিকৃৎ হতেন।’

৫.
ঋত্বিকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাঁর সিনেমাগুলোতে স্পষ্ট, দেশভাগের ফলে শরণার্থী হবার যে যন্ত্রণা তাঁর মধ্যে ছিল সেটা তিনি নানাভাবেই প্রকাশ করতে চেয়েছেন। ঋত্বিকের নিজের ভাষায়, ‘বাংলা ভাগটাকে আমি কিছুতেই গ্রহণ করতে পারিনি - আজও পারি না। ইতিহাসে যা হয়ে গেছে তা পাল্টানো ভীষণ মুশকিল, সেটা আমার কাজও নয়। সাংস্কৃতিক মিলনের পথে যে বাধা, যে ছেদ, যার মধ্যে রাজনীতি-অর্থনীতি সবই এসে পড়ে, সেটাই আমাকে প্রচণ্ড ব্যথা দিয়েছিল।’




৬.
মেঘে ঢাকা তারা, কোমল গান্ধার ও সুবর্ণরেখা এই তিনটি সিনেমাকে একত্রে ‘পার্টিশন ট্রিলজী’ বা ‘দেশভাগ ত্রয়ী’ বলা হয়ে থাকে। তিনটি মুভিতেই রবীন্দ্রসঙ্গীতের একটি বড় ভূমিকা আছে। একটি সাক্ষাৎকারে ঋত্বিক বলছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথকে ছাড়া আমি কিছুই প্রকাশ করতে পারি না। আমার জন্মের অনেক আগেই তিনি আমার সমস্ত অনুভূতি জড়ো করে ফেলেছিলেন। তিনি আমাকে বুঝেছিলেন এবং সেসব লিখেও ফেলেছিলেন। আমি যখন তাঁর লেখা পড়ি তখন আমার মনে হয় যে সবকিছুই বলা হয়ে গেছে এবং নতুন করে আমার আর কিছুই বলার নেই।’



৭.
একজন কম্যুনিস্ট হিসেবে ঋত্বিক তার সিনেমার মাধ্যমে সমাজের অরাজকতা আর অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন প্রতিনিয়ত। তাঁর কোনো ছবিতেই আমরা উচ্চবিত্তের গল্প দেখতে পাই না। তিনি চিরকাল বঞ্চিতজনের পাশে দাঁড়িয়েছেন, শোষিত মানুষের সমর্থনে উচ্চকণ্ঠ থেকেছেন। ক্রমাগত অসুস্থতা আর অতিরিক্ত মদ্যপানে শরীর ভেঙে পড়ার পরও তাই ঋত্বিক হাল ছাড়েন না। তাঁর সিনেমার চরিত্রগুলোর মতোই নতুন দিনের স্বপ্ন দেখেন। তিনি বলেন, ‘আমি আজও মরে যাইনি। আমি আজও হার স্বীকার করিনি। আমি নীরবে সে সুযোগের অপেক্ষায় আছি। আজ না পারি কাল, কাল না পারি পরশু প্রমাণ করে দেব। আজ আমি সংগ্রামী মানুষের পাশে এসে দাঁড়াবার ক্ষমতা রাখি। তাদের আমি ভুলে যাইনি। অভাব, অনটন, অপবাদ কিছুই আমাকে পথভ্রষ্ট করতে পারবে না তার জন্য যে মূল্যই দিতে হয় আমি প্রস্তুত।’



৮.
রাজনীতি সম্পর্কে ঋত্বিক ঘটক বলতেন,
“... আমি সংগ্রামী মানুষের পাশে এসে দাঁড়াবার ক্ষমতা রাখি। তাদের আমি ভুলে যাইনি, অভাব-অনটন-অপবাদ কিছুই আমাকে পথভ্রষ্ট করতে পারবে না, তার জন্য যে মূল্যই দিতে হয় আমি প্রস্তুত। মরবার আগে আমি প্রমাণ করে দিয়ে যাব আমার চারপাশের জনতার চাইতে আমি অন্যরকম।”
“রাজনীতি জীবনের একটা বিরাটতম অংশ, রাজনীতি ছাড়া কিছুই হয় না, প্রত্যেকেই রাজনীতি করে, যে করে না বলে সে-ও করে। অ্যাপোলিটিক্যাল বলে কোনো কথা নেই। You are always a partisan, for or against”
সিনেমায় নীলকণ্ঠ বাগচীর সংলাপে আরো বলছেন,
‘‘সব মাতাল, ... আমাদের সমস্ত জেনারেশনটার কোনো ভবিষ্যত নেই। প্রস্তুতি, একটা কিছু থাকতে হবে। অনেক পথ। আমাদের বাংলার হিস্টোরি কন্ডিশনটা কেউ সাইয়েন্টেফিকলি রিয়েলাইজ করেনি, বিজ্ঞানের সূত্রে ইলাস্টিক গ্রোথ হয়নি। এবং ইকোনমিক কজগুলো গত ২০০ বছরের উত্থান-পতন বিশেষ করে এ যে ৪৭ সালের বিশাল বিশ্বাসঘাতকতা, জাতীয় মুক্তি আন্দোলন, ন্যাশনাল লিবারেশনের পিঠে ছুরি মেরে বুর্জোয়াদের ১৫ আগস্টের বিরাট বিট্রেয়াল, ইন্ডিপেনডেন্স। থু...।’’



৯.
সিনেমার দর্শনের ব্যাপারে ঋত্বিক বলতেন, ‘সিনেমা কোনো গূঢ় ব্যাপার নয়। আমি মনে করি, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই সিনেমা নির্মাণ শুরু হয়। কারও যদি নিজস্ব কোনো দর্শন না থাকে, তার পক্ষে কোনো কিছু সৃষ্টি করা সম্ভব নয়'।
* চলচ্চিত্র সম্পর্কে ঋত্বিক ঘটক বলতেন,
''আমি প্রতি মুহূর্তে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে বোঝাব যে, ইট ইজ নট এন ইমেজিনারি স্টোরি বা আমি আপনাকে সস্তা আনন্দ দিতে আসিনি। প্রতি মুহূর্তে আপনাকে হাতুড়ি মেরে বোঝাব যে যা দেখছেন তা একটা কল্পিত ঘটনা, কিন্তু এর মধ্যে যেটা বোঝাতে চাইছি আমার সেই থিসিসটা বুঝুন, সেটা সম্পূর্ণ সত্যি, সেটার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই আমি আপনাকে এলিয়েন্ট করব প্রতি মুহূর্তে। যদি আপনি সচেতন হয়ে উঠেন, ছবি দেখে বাইরের সেই সামাজিক বাধা দুর্নীতি বদলের কাজে লিপ্ত হয়ে উঠেন, আমার প্রোটেস্টাকে যদি আপনার মধ্যে চাপিয়ে দিতে পারি তবেই শিল্পী হিসেবে আমার সার্থকতা।''


১০.
‘আমি মনে করি, আমার জীবনে যে সামান্য কয়েকটি ছবি করেছি সেগুলো যদি পাল্লার একদিকে রাখা হয়, আর মাস্টারি যদি আরেক দিকে রাখা হয় তবে মাস্টারিটাই ওজনে অনেক বেশি হবে। কারণ কাশ্মীর থেকে কেরালা, মাদ্রাজ থেকে আসাম পর্যন্ত সর্বত্র আমার ছাত্র-ছাত্রীরা আজকে ছড়িয়ে গেছে। I have contributed at least alittle in their luck which is much more important than my own film making.’

১১.
তিনি স্ত্রী সুরমা ঘটককে বলতেন,
‘লক্ষ্মী, টাকাটা তো থাকবে না, কাজটা থাকবে। তুমি দেখে নিও আমি মারা যাওয়ার পর সব্বাই আমাকে বুঝবে।’ আজ আমরা জানি, ঋত্বিক ঘটক ভুল বলেননি।।

-----
"আর কেউ নেই যে কড়কাবে
বিদ্যুচ্চাবুকে এই মধ্যবিত্তি , সম্পদ , সন্তোষ
মানুষের । তুমি গেছো , স্পর্ধা গেছে , বিনয় এসেছে
পোড়া পাথরের মতো পড়ে আছো বাংলাদেশে , পাশে
ঋত্বিক , তোমার জন্যে তুচ্ছ কবি আর্তনাদ করে।"
                                     -শক্তি চট্টোপাধ্যায়।




তথ্যসুত্রঃ
  • শিবাদিত্য দাশগুপ্ত ও সন্দীপন ভট্টাচার্য সম্পাদিত, সাক্ষাত ঋত্বিক; দীপায়ন কলকাতা; জানুয়ারি, ২০০০।
  • ঋত্বিকমঙ্গল: বাংলাদেশে ঋত্বিক চর্চার দলিল (১৯৭২-২০০০), সাজেদুল আউয়াল।
  • একটা মাগাজিনে অরিন্দম গুস্তাভো বিশ্বাসের লেখা।
  • যুক্তি তক্কো আর গপ্পো ছবিতে নীলকণ্ঠ বাগচীর সংলাপ।
  • ব্লগ,পত্রিকা।